|
দিনাজপুরে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন প্রকল্প
অনেক মুনাফার হাতছানি৷ কীসের বিনিময়ে মোটা মুনাফা?
কে হবে বেশি লাভবান? কার হবে বেশি ক্ষতি? |
|
|
| বাংলাদেশের উত্তরপশ্চিমাঞ্চল জেলা দিনাজপুরে চলছে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের জোর প্রসুতি৷ বিদেশী কোম্পানি এশিয়া এনার্জির সাথে চুক্তি হয়েছে বাংলাদেশ সরকারের৷ কোম্পানি বলছে বাংলাদেশের কোনো ঝুঁকি নেই; নেই কোনো বিনিয়োগ চিনা৷ তার কেবলই লাভ৷ কিন্তু তার পরেও অনেক প্রশ্ন৷ কীসের বিনিময়ে পাবো আমরা মোটা মুনাফা? কে হবে বেশি লাভবান? কার হবে ক্ষতি? কয়লা নিয়ে ফিলিপ গাইনের প্রতিবেদন৷ |
বড় বুকচি, ছোট বুকচি৷ দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ী থানার দুটো সানাল গ্রাম৷ পাশাপাশি৷ বরেন্দ্রভূমির এ গ্রাম দুটোর পূর্বদিকে বনভূমিতে আকাশিয়া-মিনজুরির কৃত্রিম বনায়ন৷ দূর থেকে দেখতে অনেকটা দ্বীপের মত৷ উঁচু একফালি জমির উপর লাগানো বাগানের জায়গায় এক সময় ছিল শালবন৷ গ্রামের উত্তরে ও পূর্বে উঁচু-নিচু জমি৷ নিচু জমিতে সানাল নারী-পুরুষেরা ধানের চারা লাগাচ্ছে৷ উঁচু জমিতে আবাদ হয়েছে গম, সরিষা ও অন্যান্য রবিশস্য৷ খাঁজকাটা জমির ভাঁজে ভাঁজে সবুজের সমারোহ৷ দিগন্ত রেখা জুড়ে একসারি ইউক্যালিপটাস৷ সানাল গ্রাম দুটোর ভেতর আরো চমত্কার দেখতে৷ বিশাল বিশাল মাটির ঘর৷ অধিকাংশ ঘরে কোনো জানালা নেই৷ পরিচ্ছন্ন দুটো গ্রাম যে দীর্ঘ দিনের পুরানো তাতে কোনো সন্দেহ নেই৷ |
| দুটো গ্রামই পড়েছে ফুলবাড়ী কয়লা খনি এলাকায়৷ উন্মুক্ত পদ্ধতিতে উত্তোলনের জন্য কয়লা খনির কাজ শুরু হলে কালক্রমে সানাল গ্রাম দুটোর আর নাম-নিশানা থাকবে না৷ হারিয়ে যাবে কয়লা খনির গভীরে৷ এ কথা গ্রামবাসী আজ জেনে গেছে৷ কয়েক বছর ধরেই এলাকাব্যাপী চলেছে কয়লা-তল্লাশী৷ দেশি-বিদেশী সাহেবরা এসেছেন, এসেছে কতো না যন্ত্রপাতি! অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে ড্রিলিং করে মাটির গভীর থেকে বের করে এনেছে কয়লা৷ গ্রামবাসী কৌতুহলী দৃষ্টি দিয়ে দেখেছে সেসব৷ তাদেরকে বলা হয়েছে কয়লার খনি হবে এখানে৷ সবাই ভেবেছে খনি হবে সেতো বেশ৷ এলাকাবাসীর উপকার হবে৷ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বাড়বে দেশের৷ কিছুদিন হলো তারা জানতে পেরেছেন যে, কয়লাখনি হবে এমন এক পদ্ধতিতে বাংলাদেশে আগে যা কেউ দেখেনি৷ অর্থাত্ উপর থেকে সব মাটি সরিয়ে ফেলে কয়লা তোলা হবে৷ এর মানে পুরো এলাকা তলিয়ে যাবে মাটির গর্ভে৷ তাদের সোনার ফসলে ভরা মাট-ঘাট হারিয়ে যাবে চিরদিনের জন্য৷ একথা জানার পর বড় বুকচি ও ছোট বুকচি গ্রামের সানালরা ফুঁসছে৷ ফুঁসছে আরো বহু গ্রাম৷ |
| বড় বুকচি গ্রামে ঢুকতে আমরা প্রথমেই সাক্ষাত্ পাই মাঝ বয়সী এক সানালের৷ কয়লা খনির ব্যাপারে মানুষের দুঃখ আর ক্ষোভের কথা আগেই জেনে গেছি৷ সরাসরি কয়লার কথা না বলে আমরা তার সাথে কথা বলি গ্রামের পূর্বপাশের "সমাজিক বনায়ন" নিয়ে৷ তাকে আমাদের সাথে আসতে অনুরোধ করি৷ তিনি আমাদেরকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থে তৈরি করা "সামাজিক বনায়নে" তার অংশীদারিত্বের প্লট পর্যটন আসেন৷ প্রায় পনেরো বছর আগে লাগানো এ প্লটটি এবারই কাটা হবে বলে জানান তিনি৷ |
| বনবাগান ধরে আমরা হাঁটি উত্তর দিকে৷ বাগানের উত্তর-পশ্চিম সীমানা থেকে বিস্তীর্ণ চাষের জমি৷ উঁচু-নিচু৷ বরেন্দ্র এলাকার চিরায়ত দৃশ্য৷ পড়ন বিকেলে লালমাটির দিগন বিসৃত মাঠে সোনালি আভা আমাদের মন কাড়ে৷ জমির আল ধরে আমরা হাঁটি৷ দেখা পাই কিছু সানাল নরনারীর৷ তারা নীরবে কাজ করছেন৷ আমাদের দিকে কোনো ভ্রুপে নেই৷ আমাদের অসিত্বকেই তারা যেন স্বীকার করতে চান না৷ |
| এক সময় বিভিন্ন বয়সের চার-পাঁচ জন সানাল নরনারীর সাথে কথা বলার চেষ্টা করি৷ আমরা এটা ওটা জিজ্ঞেস করি৷ কিন্তু তারা কেউ মুখ খুলতে চান না৷ কৌতুকপূর্ণ কথা বলি৷ তাতে কিছুটা কাজ হয়৷ দুএকটি কথা বলতে শুরু করেন কেউ কেউ৷ এক বৃদ্ধা বিরক্তিমাখা মুখে যা বললেন তার অর্থ হলো তারা ঢাকা থেকে আসা মানুষদেরকে আর বিশ্বাস করেন না৷ ঢাকার মানুষেরা তাদের সাথে প্রতারণা করেছে৷ তাদের কাছে উন্মুক্ত খনির কথা গোপন রেখে জরিপ করেছে৷ এখন তারা শুনছেন তাদের এই তে-খামার ছেড়ে চলে যেতে হবে৷ এতে তারা ভীষণ ক্ষুব্ধ৷ |
| কারা এই ঢাকার মানুষ? কোম্পানির মানুষ? এরা মূলত বাংলাদেশের সাথে কয়লা তোলা ও তার ব্যবসার জন্য চুক্তিবদ্ধ ব্রিটিশ কোম্পানি এশিয়া এনার্জির লোক৷ এরা অনেকে বিদেশী সাহেব৷ অনেকে বাংলাদেশী সাহেব৷ এরা পরিবেশবাদী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি৷ এরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক৷ এরা এশিয়া এনার্জির পরামর্শক৷ সানালরা ধরেই নিয়েছে আমরা এশিয়া এনার্জির লোক৷ তাই তারা আমাদেরকে তাড়িয়ে দিতে চাচ্ছে তাদের মাটি থেকে! |
| কিন্তু আমরা নাছোরবান্দা৷ সানালদের কথা শোনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি৷ এদেরই একজন বড় বুকচি গ্রামের রীনা টুডু (৪৫)৷ তার চাষের জমি ২০ বিঘার মতো এবং বসতভিটা ও ধানের জমি আরো পাঁচ বিঘার মতো৷ এ জমিই তার জীবন-জীবিকার একমাত্র উত্স৷ "আমরা দরকার হলে এখানেই মরব কিন্তু জমি ছাড়ব না৷ আমরা এখানে এমন খনি চাই না যা আমাদেরকে উচ্ছেদ করবে," সাফ কথা রীনা টুডুর৷ তিনি তার নিজের জমিতেই কাজ করছিলেন৷ তার মনের কষ্ট বুঝতে কষ্ট হয় না৷ |
| আবাদি জমি ছেড়ে এবার আমরা গ্রামের মধ্যে ঢুকি৷ কী সুন্দর গ্রাম৷ কিন্তু সানালদের মুখগুলো সব ভীষণ ব্যাজার৷ রাসার উপর দুই প্রবীণ ব্যক্তি বসে আছেন৷ তাদের মধ্যে একজন পাউলুস টুডু৷ বয়স ষাটের কাছাকাছি৷ তার মুখে কোনো কথা নেই৷ চোখে-মুখে হতাশা, বেদনা, আশংকা৷ আমাদের দিকে তাকাতেই বুঝি, আমরা বিশ্বাসযোগ্য নই৷ তার বাড়ির ভিতরটা দেখতে চাই৷ তিনি আমাদের নিয়ে যান ভেতরে৷ তার আকুতি, "আমরা এখান থেকে কোথাও যাব না৷" |
| আমরা আরো কিছুক্ষন ঘুরি সানাল গ্রামে৷ সবার মুখে বিষাদের ছায়া৷ বড় বুকচি গ্রামের পাশেই ছোট বুকচি৷ যাই সেখানে৷ একটি বাড়ির মধ্যে ঢুকি৷ এক সানাল নারী রান্না চাপিয়েছেন উঠোনের উনুনে৷ স্বভাবসুলভ সানালি আতিথেয়তা না জানালেও আমাদেরকে বসার জায়গা করে দেন৷ আমরা জানতে চাই খনির ব্যাপারে৷ ভীষণ হতাশ তিনি৷ তিনি কোনোভাবেই নিজের নাম আমাদেরকে বললেন না৷ কারণ আমরা ঢাকার মানুষ এবং আমাদের প্রতি তার বিশ্বাস নেই৷ তার অভিযোগ, "ঢাকার মানুষেরা আমাদের ছবি করেছে এবং চলে গিয়েছে৷ এখন শুনতে পাই খনির জন্য আমাদের চলে যেতে হবে ভিটেমাটি, জমিজমা ছেড়ে৷ আমরাতো ঢাকার মানুষকে আর বিশ্বাস করি না৷" |
| বড় বুকচি ও ছোট বুকচি গ্রামে শ'খানেক সানাল পরিবার বাস করেন৷ খনির পক্ষ নেয়ায় এবং অন্য কিছু সমস্যার কারণে একটি পরিবার বিতাড়িত হয়েছে ছোট বুকচি গ্রাম থেকে৷ এ দুই গ্রামের মানুষের অভিযোগ চালাকি করে তাদের ঘরবাড়ি, জমিজমা ও গরুছাগলের হিসাব নিতে গিয়ে ঠিকমত কিছুই হয়নি৷ |
| সন্ধ্যা নামে৷ আমরা সানাল গ্রাম পেছনে ফেলে রওনা হই ফুলবাড়ী থানা শহরের দিকে৷ অনরের চোখ দিয়ে দেখতে পাই বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে হাজার ফুট গর্ত, কয়লা খনি৷ কত কিছু ঘটবে এখানে৷ ধরিত্রীর বুক চিড়ে এখানে ঘটবে কত অত্যাচার, কাঁদবে কতো মানুষ! |
দিনাজপুর জেলায় চারটি উপজেলার (ফুলবাড়ী, বিরামপুর, নওয়াবগঞ্জ এবং পার্বতীপুর) সাতটি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম, ফুলবাড়ী থানা সদরের একাংশ এবং হাজার হাজার একরের ফসলী জমি নিয়ে খনি এলাকা৷ ব্রিটিশ কোম্পানি এশিয়া এনার্জি বাংলাদেশ সরকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ কয়লা অনুসন্ধান ও খনি উন্নয়নের জন্য৷ কোম্পানির কয়লা তোলার এ মহাকর্মযজ্ঞ "ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প" নামে পরিচিত৷ কোম্পানি সুত্রে জানা যায় ১৯৯৪ সাল থেকে উন্মুক্ত টেন্ডারে সাড়া দিয়ে ফুলবাড়ীতে কয়লা অনুসন্ধানের কাজ শুরু৷ তখন চুক্তি হয়েছিল অস্ট্রেলীয় কোম্পানি বিপিএইচ-এর সাথে৷ পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে এশিয়া এনার্জির কাছে হসানর হয় এ চুক্তি৷ সেই থেকে এশিয়া এনার্জি কাজ করছে এবং বর্তমানে শত রকমের পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে তারা কয়লার মজুত নির্ধারণ করেছে এবং সরকারের কাছে কয়লা তোলার ব্যাপারে বিসারিত পরিকল্পনা জমা দিয়েছে৷ |
| কোম্পানির হিসাব মতে কয়লা খনির আয়তন ৫ হাজার নয়শো হেক্টর বা ৫৯ বর্গ কিলোমিটার৷ এ বিশাল এলাকার যে অংশ ফুলবাড়ী পৌরসভার মধ্যে পড়েছে সেখানে আছে বিসর পাকা ঘরবাড়ি, বাজার, স্কুল, কলেজ, পাকা সড়ক, রেলপথ ইত্যাদি৷ শহর এলাকা ছেড়ে বের হলেই ছাড়া ছাড়া গ্রামের মাঝে বিস্তীর্ণ ফসলের জমি৷ মাঝেমধ্যে টুকরো টুকরো বনবাগান৷ চোখ জুড়ানো নিসর্গের গভীরে ২৭ কোটি বছরের পুরানো যে কয়লা সম্পদ সঞ্চিত হয়ে আছে তার ওপর এখন কয়লা ব্যবসায়ীদের শ্যেনদৃষ্টি৷ |
| এশিয়া এনার্জির হিসাব মতে এখানে কয়লার মজুত ৫৭২ মিলিয়ন টন৷ বর্তমান খনি এলাকার দক্ষিনে ড্রিলিং হলে আরো কয়লার খোঁজ পাওয়া যাবে বলে এশিয়া এনার্জির বিশ্বাস৷ |
| লাভ-ক্ষতির হিসাব |
এশিয়া এনার্জি নিরলসভাবে ঢাকাবাসী ও দেশবাসীকে বোঝাচ্ছে কয়লাখনি হলে বাংলাদেশের অনেক লাভ হবে৷ কয়লার লাভক্ষতি নিয়ে এশিয়া এনার্জিকে একটি জরিপ করে দিয়েছে এশিয়া এনার্জির নিয়োগ করা আনর্জাতিক প্রতিষ্ঠান জিএইচডি৷ ঐ জরিপের স ত্র ধরে এশিয়া এনার্জির দাবি খনির ৩০ বছরের মেয়াদকালে বাংলাদেশ ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বর্তমান ডলারের বাজার মূল্যে যার পরিমাণ একশো সাতচলি্লশ হাজার কোটি টাকা) সমপরিমাণ সুফল পাবে৷ এর থেকে সরাসরি সুফল পাওয়া যাবে ৭.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং প্রত্যক বা গুণক ফল হিসাবে পাওয়া যাবে আরো ১৩.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার৷ খনি এবং তার উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা বিদু্ত্ কেন্দ্র প্রতিবছর বাংলাদেশের জিডিপিতে এক শতাংশ অবদান রাখবে৷ এশিয়া এনার্জির এ হিসাব কতোটা নির্ভরযোগ্য? এর জবাবে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহম্মদ দৈনিক সংবাদকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, "খনি প্রকল্পের এ মূল্যায়ন এক ধরনের জালিয়াতি৷ এশিয়া এনার্জির বিনিয়োগের ফলে বাংলাদেশে আর্থিক লাভের পরিমাণ অনেক বেশি দেখানো হয়েছে এবং ক্ষতির পরিমাণ দেখানোই হয়নি৷ এশিয়া এনার্জি নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে তা চাপা দিতে এটি এশিয়া এনার্জির এক ধরনের জালিয়াতি৷" |
| উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই হচ্ছে৷ তবে বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশে এ পদ্ধতির প্রয়োগ হলে লাভ কী হবে এবং মানুষ ও পরিবেশের কী তি হবে তা নিয়ে হাজারো প্রশ্ন জনমনে৷ এই লাভ-ক্ষতি নিয়ে খনি এলাকায় উত্তেজনা চরমে৷ জাতীয় পর্যায়ে কিছু আলোচনা চলছে কয়লা নীতি, এশিয়া এনার্জির সাথে চুক্তি এবং লাভক্ষতি নিয়ে৷ |
| সরকার ও বিরোধীদল অর্থাত্ দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলসমূহ খনির পক্ষে। খনি এলাকার বিক্ষুব্ধ মানুষের জন্য এটি খারাপ খবর৷ এলাকাবাসী অনেকে অভিযোগ করছেন যে দেশের অন্যান্য এলাকার মানুষ তাদের মনোকষ্টের কথা বুঝতে পারছে না এবং উন্মক্ত খনি হলে এলাকার ভয়াবহ চিত্র তারা কল্পনা করতে পারছে না৷ |
| এশিয়া এনার্জি তির কথা বলছে না এমন নয়৷ তবে তাদের ক্ষতির হিসাব নিয়ে অনেক প্রশ্ন ও বিতর্ক৷ বিতর্কের প্রথম বড় জায়গা কতো মানুষ উচ্ছেদ হবে তা নিয়ে৷ কোম্পানি বলছে খনির প্রয়োজনে উচ্ছেদ হবে শ'খানেক গ্রামের ৪০ হাজার মানুষ৷ উচ্ছেদের মধ্যে পড়বে ফুলবাড়ী শহরের প বের একটি অংশ৷ কোম্পানির এ হিসাব এলাকাবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়৷ ফুলবাড়ী রা কমিটির বিভিন্ন স ত্র জানিয়েছে সরাসরি এবং প্রত্যভাবে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের সংখ্যা কোম্পানির দেয়া সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি হবে৷ "আমাদের হিসাব মতে প্রত্যভাবে তিগ্রস্থ হবে এক থেকে দেড় লাখ এবং পরোভাবে তিগ্রস্থ হবে দুই থেকে আড়াই লাখ মানুষ," বললেন ফুলবাড়ী মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্য, থানা বিএনপির সভাপতি এবং ফূলবাড়ী রা কমিটির নেতা মোঃ খুরশিদ আলম মতি৷ তার ক্ষোভের শেষ নেই৷ "আমরা শুনেছিলাম এখানে কয়লা আছে৷ তবে আমাদের বসতভিটা স্কুল, কলেজ এবং নানা স্থাপনা ধ্বংস করে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লাখনি হবে তা জানিয়ে এশিয়া এনার্জির লোকজন আমাদের সাথে পরামর্শ করেনি৷ আমরা উন্মুক্ত খনি চাই না৷ দলমত নির্বিশেষ সবাই আমরা উন্মুক্ত খনির বিপক্ষে" জানালেন অধ্য মতি৷ "আমাদের আন্দোলন অসিত্ব রক্ষার জন্য৷ ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও আমরা যাব না৷" |
| শত গ্রাম, হাজার হাজার মানুষ, তাদের ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ করে, হাজার হাজার একরের ফসলী জমি নষ্ট করে উন্মুক্ত খনির কথা চিনা করেই এলাকাবাসী আঁত্কে উঠেন৷ ফুলবাড়ী মহিলা ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক নিমা বণিকের কথাতে এলাকাবাসীর মনোকষ্টের প্রতিফলন দেখি৷ "বাসুভিটা থেকে উচ্ছেদ করে অন্য যেখানেই রাখা হোক না কেন আমরা তো আমাদের ঐতিহ্য, সামাজিক বন্ধন, ব্যবসা সব হারাবো৷ আমাদের যে ক্ষতি হবে তা কোনোভাবেই পূরণ হবে না৷ আমরা এশিয়া এনার্জির হিসাব বিশ্বাস করি না৷ কোম্পানির হিসাব মনগড়া," বললেন নিমা বণিক৷ |
| তাদের এ অভিযোগ এবং আশংকার কথা নাকচ করে দিয়ে এশিয়া এনার্জির জেনারেল ম্যানেজার (এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড কমিউনিটি) এম. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, "আমরা সব সময় উন্মক্ত পদ্ধতিতে কয়লাখনি করার কথা বলেছি৷ ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতি ছাড়া আর কোনো উপায় নেই৷" তার দাবি, "ফুলবাড়ী শহরের পূর্বাংশের অধিকাংশ এলাকা খনির বাইরে রাখতে আমরা কয়লা উত্তোলন পরিকল্পনা পরিবর্তন করেছি৷ এর ফলে আমরা ২০ মিলিয়ন টন কয়লা কম উত্তোলন করব৷ ক্ষতির পরিমাণ কমাতেই এ ব্যবস্থা"৷ |
| কোম্পানির কথামত তি যা হবে তা পুষিয়ে দেয়া হবে এবং প্রকল্প এলাকার মানুষের অবস্থা আগের থেকে আরো ভালো হবে৷ এলাকাবাসী যাদের সাথে কথা বলেছি তাদের অধিকাংশ একথা বিশ্বাস করেন না৷ তাদের সাফ কথা "আমরা উন্মুক্ত খনি চাই না৷" তাদের দাবির সমর্থনে প্রতি শনিবার ফুলবাড়ীতে অনেকদিন ধরে মিছিল মিটিং আয়োজন করছে ফুলবাড়ী রা কমিটি৷ |
| জাতীয় স্বার্থ ও লাভ-ক্ষতি প্রসঙ্গে এশিয়া এনার্জির যুক্তি হলো খনির জন্য বাংলাদেশের কোনো ঝুঁকি নেই৷ নেই কোনো বিনিয়োগ চিনা৷ কোম্পানির হিসাবে বাংলাদেশ খনি থেকে অর্জিত মুনাফার প্রায় অর্ধেক পাবে৷ এর মধ্যে অর্ন্তভুক্ত ৬ শতাংশ রয়েলটি, ৪৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক৷ অন্যান্য সুবিধার মধ্যে পড়বে দেশের জন্য নতুন শক্তির উত্স, রপ্তানি করার জন্য নতুন পণ্য, নতুন নতুন শিল্প, কর্মসংস্থানের সুযোগ, আঞ্চলিক উন্নয়ন, নতুন রেলপথ এবং বন্দর স্থাপনা৷ কোম্পানির হিসাব প্রত্যাখান করে অধ্যাপক আনু মুহম্মদ বলছেন, "যে কোম্পানি কয়লা তুলবে লাভক্ষতি নিয়ে তার হিসাব নির্ভরযোগ্য নয়; নির্ভরযোগ্য নয় পরিবেশ ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া যাচাই (ইআইএ ও এসআইএ) প্রতিবেদন৷ ক্ষতির কথা কোম্পানি স্বীকার করছে, তবে তা চাপা পড়ে যাচ্ছে বাগাড়ম্বরের মধ্যে৷" তার আশংকা, "কয়লা বাংলাদেশের মাটিতে কিনু এর মালিক হয়ে যাবে বাইরের কোম্পানি৷ বাংলাদেশ যা পাবে এবং যা হারাবে তার সঠিক হিসাব করার কোনো ব্যবস্থা নেই৷ বাংলাদেশকে তারই দেশের কয়লা কিনতে হবে আন্তর্জাতিক বাজার মূল্যে, কোম্পানির কাছ থেকে৷" |
| লাভ-ক্ষতি হিসাবের ক্ষেত্রে আমরা কতকগুলো ব্যাপারে বিশেষ কিছুই শুনতে পাই না৷ যেমন, যে কয়লা নিয়ে এতো টানাপোড়েন অত্যন্ত উন্নত মানের৷ কোম্পানির দেয়া তথ্য অনুসারে ২৭ কোটি বছরের পুরানো এ কয়লার সিংহভাগ রপ্তানি হবে৷ এ কয়লার পরিমাণ বিপুল এবং এর ২৫ শতাংশ স্টীল উত্পাদনের কাঁচামাল যার মূল্য টনপ্রতি অন্য কয়লা থেকে অনেক বেশি৷ কয়লার বাজার মূল্য, যারা ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পে বিনিয়োগ করবে শেয়ার বাজারে তাদের অবস্থা এসব ব্যাপারেও আমরা একেবারে অন্ধকারে৷ এ নিয়ে আমাদের নিজস্ব মূল্যায়ন নেই৷ কয়লার পাশাপাশি আরো কিছু মুল্যবান উপাদান পাওয়া যাবে খনি থেকে৷ যেমন, গ্লাস তৈরি কাঁচামাল হিসাবে বালু, চিনামাটি, নুড়ি, কাদা এবং পানি৷ এসবের মালিকও তো কোম্পানি৷ এগুলো থেকে আয় হবে৷ এসব থেকে যে সুবিধা বাংলাদেশের পাওয়ার কথা তা নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা শোনা যায় না৷ |
| পরিবেশ প্রতিক্রিয়া |
| উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে এর পরিবেশ প্রতিক্রিয়া বড় উদ্বেগের ব্যাপার৷ এ পদ্ধতিতে খনি করতে প্রথমেই যে কাজটি করতে হবে তা হলো খনি এলাকাকে পানিশ ন্য করতে হবে যাতে খনিগর্ভ পানিতে ডুবে না যায়৷ কাজটি মোটেও সহজ নয়৷ এজন্য খনির চারদিকে বিশাল বিশাল সব পাম্প মেশিন বসাতে হবে৷ এসব পাম্পের মাধ্যমে যতদিন খনি থাকবে ততদিন দিনরাত চবি্বশ ঘণ্টা মাটির গভীর থেকে পানি তুলতে হবে৷ অর্থাত্ খনির গভীরে প্রবেশের আগেই পানি তুলে ফেলতে হবে৷ এর প্রতিক্রিয়া হবে৷ এমনিতেই বরেন্দ্র এলাকায় পানির সমস্যা আছে৷ শুষ্ক মৌসুমে নলকূপে পানি উঠে না৷ খনির প্রয়োজনে বিশাল এলাকা জুড়ে পানিশূন্য করার ফলে সাধারণ ও গভীর নলকূপ দিয়ে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাবে কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে৷ এ অবস্থায় কৃষকের কী হবে৷ এশিয়া এনার্জির সমাধান হলো মাটির গভীর থেকে তুলে আনা পানি বণ্টন করা হবে কৃষকের মাঝে৷ এখানে প্রশ্ন পানির বণ্টন ব্যবস্থা ন্যায্য হবে তো? এ ব্যাপারে বাংলাদেশের কোনো প্রাক ধারণা না থাকায় আশংকামুক্ত হবার কোনো উপায় নেই৷ উত্তরবঙ্গে মরুকরণ প্রক্রিয়া ঠেকাতে বহুবছর ধরে গাছ লাগানোসহ নানা প্রচেষ্টা চলছে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে৷ মরুকরণ প্রক্রিয়া আবারো যদি ত্বরান্বিত হয়, তবে উপর থেকে পানি ঢেলে তা ঠেকানো যাবে কিনা সে ব্যাপারেও প্রশ্ন রয়েছে৷ |
| উন্মুক্ত খনি মানেই খনি এলাকার নিসর্গের সম্পূর্ণ বিনাশ৷ কয়লা পর্যন্ত পেঁছৌতে কোথাও কোথাও প্রায় হাজার ফুট গর্ত করতে হবে৷ ফুলবাড়ী খনিতে যে কয়লা পাওয়া গেছে তার পুরুত্ব গড়ে ৩৮ মিটার বলে জানিয়েছে এশিয়া এনার্জির এক কর্মকর্তা৷ কয়লা তোলার পর তাহলে আমরা পাচ্ছি হাজার ফুট গর্ত৷ প্রথম যে এলাকার মাটি সরিয়ে ফেলা হবে কয়লা তোলার পর সে গর্ত ভরা হবে এবং পাশে তৈরি হবে নতুন গর্ত৷ মাটি দিয়ে গর্ত ভরাট করার পরই তা আর ব্যবহারোপযোগী হচ্ছে না৷ কোম্পানির কথামত মাটির টপসয়েল বা উপরিতল আলাদা করে সংরণ করে তা পরবর্তীতে ভরাট করা জায়গার উপর ছড়িয়ে দিলেও কবে নাগাদ এলাকাটি আবার চাষের উপযোগী হবে তা বলা মুশকিল৷ উন্নত দেশে যেভাবে যত্নের সাথে খনির গর্ত ভরাট করা হয় বাংলাদেশে তেমনি হবে তো? কারণ বাংলাদেশে প্রচলিত আইনের অপপ্রয়োগ খুব স্বাভাবিক৷ খনির খোড়াখুড়ির শেষ পর্বে অর্থাত্ এর মেয়াদ শেষে একটি অংশ বিশাল গর্তই থেকে যাবে৷ এশিয়া এনার্জি বলছে এটি পূর্ণ হবে স্বাদু পানিতে যেখান থেকে মানুষজন পানি পাবে৷ সেখানে মাছ চাষ করা যাবে এবং বিনোদনেরও ব্যবস্থা করা যাবে৷ তিরিশ বছর বা তারও অধিককাল ধরে খোড়াখুড়ির ফলে তরল যেসব দুষণের মিশ্রণ ঘটবে তা যে সহজে স্বাদু পানিতে রূপান্তরিত হয়ে যাবে এমন আশা করা যে ঠিক নয় সে ব্যাপারে সতর্ক করেছেন খনি বিশেষজ্ঞরা৷ |
| পরিবেশগত অন্যান্য যেসব দ ষণ সৃষ্টি হবে সেসব মোকাবিলা করাও কঠিন চ্যালেঞ্জ৷ খনির ভেতরে চলবে ডিনামাইট বিস্ফোরণ, কয়লা ভাঙ্গার জন্য৷ খনির ভেতরে বাইরে বসবে নানা যনপাতি৷ চলবে বিশাল বিশাল ট্রাক, কয়লার ট্রেন৷ এসব থেকে যে শব্দ দুষণ হবে তার কিছু কুফল তো আছেই৷ বায় দুষণ ঘটবে কয়লার ধুলা-ময়লা থেকে৷ বাংলায় একটা কথাই আছে "কয়লা ধুইলে ময়লা যায় না"৷ অর্থাত্ কয়লা ধোয়ার প্রক্রিয়ায় যে বিপুল পরিমাণ দুষিত পানির সৃষ্টি হবে তা শতকরা একশো ভাগ শুদ্ধ করা হবে তো? যদি না হয় তবে তা আশপাশের মাছসহ নানা প্রাণ সংহার করে চলবে৷ মাটির উলোটপালট যেভাবে হবে তাতে তো মাইক্রো-অর্গানিজম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে৷ কয়লা পুড়িয়ে বিদু্যত্শক্তি উত্পাদনের জন্য বায়ু দুষণ যে ঘটবে (স্বল্প মেয়াদে) তাতে তো কোনো সন্দেহ নেই৷ সালফার ডাই অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পান্ডস (ভিওসিন), মার্কারি, সীসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক এসব বায়ুদ ষণকারী উপাদান থেকে মাটি, জলাশয়, জীবজগত, উদ্ভিদ সবই দুষণের শিকার হবে৷ এসব দুষণ দুর করা নিঃসন্দেহে বড় চ্যালেঞ্জ৷ এশিয়া এনার্জি আশা করছে এসব দুষণ সহনীয় মাত্রায় রাখা যাবে৷ তবে অনেকে তা মনে করেন না৷ কেউ কেউ বলেন এসব দুষণ খনি এলাকার জন্য এক সময় নরক যন্ত্রণা হিসাবে দেখা দিবে৷ এসব দুষণ দুর করার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয়ে যেসব ব্যবস্থা নেয়া দরকার হবে তা কোম্পানি পুরোপুরি নিবে না বলেই অনেকের আশংকা৷ |
| কয়লার পরিবহণ আরেকটি বড় উদ্বেগের কারণ৷ বাজারজাতকরণের জন্য দিনাজপুর থেকে কয়লা নিয়ে যাওয়া হবে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে গভীর সমুদ্র বন্দরে৷ এর জন্য তৈরি হবে নতুন রেলপথ এবং সমুদ্রবন্দর৷ এর ফলে কর্মসংস্থান ও আয় হবে বটে তবে তা পরিবেশের জন্যও নতুন ভাবনা সৃষ্টি করবে৷ মংলা বন্দরের কারণে ইতিমধ্যে সুন্দরবনের মধ্যে শব্দ দুষণ ও পানিদুষণ সেখানকার জীবজগত এবং গাছপালার জন্য সমস্যা সৃষ্টি করে আসছে৷ কয়লা পরিবহণের জন্য ৩০ বছর বা তারও অধিকাল ধরে যে বাড়তি নৌযান চলাচল করবে তা সুন্দরবনে দুষণমাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে৷ ফুলবাড়ী কয়লাখনি প্রকল্পের পরিবেশগত ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া যাচাই সম্পন্ন হয়েছে এবং তা পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিবেশ অধিদপ্তর পাশও করে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন এশিয়া এনার্জির কর্মকর্তারা৷ বিভিন্ন আন্তুর্জাতিক এবং দেশীয় কোম্পানি, বাংলাদেশের কয়েকটি পরিবেশ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি বিশেষজ্ঞ পরিবেশ ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া যাচাইয়ের কাজ করে দিয়েছে৷ আঠারো মাস ধরে ৩০০ পরামর্শক একাজটি সম্পন্ন করে দু'হাজার ছয়শো পৃষ্ঠার রিপোর্ট তৈরি করেছেন৷ আরো অনেক ধরনের রিপোর্টই তৈরি হচ্ছে৷ এসবই হয়েছে এশিয়া এনার্জির অর্থে এবং ইচ্ছায়৷ এখানেই অনেকের প্রশ্ন, যে এশিয়া এনার্জি কয়লা তুলবে তারই ইচ্ছায় ও অর্থে যে পরিবেশ ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া যাচাই হয়েছে তা কতটা নিরপে ও সঠিক হয়েছে৷ এশিয়া এনার্জির দাবি পরিবেশরা ও সামাজিক শানি রায় যা যা করা দরকার তার সবই করবে কোম্পানি। |
| |
| শেষ কথা |
| ফুলবাড়ী কয়লাখনি নিয়ে এতো প্রশ্ন, এতো আশংকার অন্যতম কারণ হলো উন্মুক্ত পদ্বতিতে কয়লা উত্তোলন যা বাংলাদেশে আগে কখনো ঘটেনি৷ তাছাড়া প্রকল্পের সাথে বাংলাদেশের কোনো কোম্পানি বা বিনিয়োগ জড়িত নেই৷ সবই হবে এশিয়া এনার্জির হেফাজতে৷ এই কোম্পানির কর্মকর্তারা যা বলবেন তাই আমাদের সত্য বলে ধরে নিতে হবে এমন একটি মনোভাব আমরা তাদের মাঝে দেখি৷ তাদের তথ্য-উপাত্ত ও বিশ্লেষণ খতিয়ে দেখার জন্য যে চেষ্টা থাকা দরকার তা আমাদের মাঝে নেই বললেই চলে৷ |
| ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প নিয়ে এলাকার ক্ষুদ্ধ মানুষ ও তাদের সমর্থকরা কঠিন অবস্থান নিলেও তারা যে কয়লা তোলার বিরোধী তা কিন্তু নয়৷ এদের সবার কথা হলো আমরা আমাদের কয়লার মালিকানা এবং ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের ভাগ্য তো বিদেশী কোম্পানি ও স্বার্থের হাতে ছেড়ে দিতে পারি না৷ কয়লা যদি তুলতেই হয় তো আমরা অপেক্ষা করিনা আরো কিছুকাল৷ এর মধ্যে প্রযুক্তি আয়ত্ব করি৷ তৈরি করি আমাদের খনি ইঞ্জিনিয়ার ও বিষেশজ্ঞ৷ "আমরা আমাদের প্রযুক্তিতে যদি মাইনিং করতে পারি তাহলে হয়তো আমরা মত দিতে পারবো," বললেন ফুলবাড়ী রা কমিটির নেতা মোঃ খুরশিদ আলম মতি৷ |
| অধ্যাপক আনু মুহম্মদের কথাও তাই৷ "আমাদের কয়লা দরকার আমাদের জ্বালানির নিরাপত্তার জন্য৷ এ কয়লার সমস দায়িত্ব আমরা বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দিতে পারি না৷ ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পে যে বিনিয়োগ হচ্ছে তাতে আমাদের খুব একটা উপকার হবে না," বলেন অধ্যাপক মুহম্মদ৷ "যে কয়লা ২৭ কোটি বছর মাটির নিচে পড়ে রয়েছে তা আরো দশ-কুড়ি বছর থাক না৷ আমরা নিজেরা তোলার চেষ্টা করি৷ তাতে আমাদের জাতীয় স্বার্থ রা হবে৷" |
| এলাকাবাসী এবং দেশীয় অনেকের মতামত নাকচ করে দিয়ে এশিয়া এনার্জির দাবি বাংলাদেশ যতদিনে নিজে কয়লা তোলার প্রযুক্তি অর্জন ও পুঁজি যোগাড় করতে পারবে ততোদিনে হয়তো আর এ জীবাশ্ম-নির্ভর শক্তির উত্সের কোনো প্রয়োজনই হবে না৷ কাজেই কয়লা তোলার এখনই মোম সময়৷ আমাদের সরকারও যদি সেটিই মনে করে তবে কীসের বিনিময়ে আমরা কয়লার মুনাফা গুনব তা খুব ভালোভাবে তিয়ে দেখা জরুরি৷ এ ব্যাপারে খনি এলাকার মানুষের স্বার্থ ও মতামত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা দরকার৷ |
| |
| ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প: কিছু মৌলিক বিষয় |
প্রকল্প উদ্যোক্তা: [লন্ডনভিত্তিক] এশিয়া এনার্জি কর্পোরেশন (বাংলাদেশ)৷
প্রধান খনিজ সম্পদ: বিটুমিনাস জাতীয় কয়লা(উচ্চ তাপমাত্রাসমঙ্ন্ন)\\তাপীয় (থার্মাল) ও ধাতব (মেটালারজিকাল)৷
বাড়তি প্রাপ্তি: চিনামাটি, গ্লাস-এর কাঁচামাল [বালু], নুড়ি, পানি ও কাদা৷
কয়লার মজুত: ৫৭২ মিলিয়ন টন (বর্তমান খনির দেক্ষিণে আরো কয়লা আছে)৷
বার্ষিক উত্পাদন: ১৫ মিলিয়ন টন৷
কয়লার ব্যবহার: বিদু্যত্ উত্পাদন কেন্দ্রে, ইস্পাত কারখানায়, অন্যান্য শিল্প কারখানায়, ও ইটের ভাটায়৷
রপ্তানি/স্থানীয় ব্যবহার: কয়লার বেশিরভাগ রপ্তানি হবে এবং দেশের মধ্যেও এর ব্যবহার হবে৷ বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং মংলা
বন্দর কর্তৃক পরে সাথে সহযোগিতার মাধ্যমে প্রধানত খুলনা এবং আকরাম পয়েন্ট দিয়ে কয়লা রপ্তানি হবে৷
প্রকল্পের মেয়াদ: ৩০ বছরের বেশি৷
প্রকল্পের সময়স চি: পানি নিষ্কাশন ২০০৬ সালে, ভৌত খনি উন্নয়ন ২০০৭ সালে এবং প্রথম কয়লা উত্তোলন ২০০৮ সালে৷
প্রকল্প এলাকা: দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ী, বিরামপুর, নবাবগঞ্জ ও পার্বতীপুর উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন এবং ফুলবাড়ী পৌরসভার প বদিকের একাংশ৷ খনি এলাকায় পড়বে বেশ কিছু আদিবাসী গ্রামসহ একশোর অধিক গ্রাম৷ খনির জন্য প্রয়োজনীয় জমি: ৫,৯০০ হেক্টর বা ৫৯ বর্গকিলোমিটার৷ স ত্র: এশিয়া এনার্জি
|
| |
ফুলবাড়ী কয়লা প্রক |