২৬ আগস্ট ২০০৬ ফুলবাড়ীর ইতিহাসে একটি কালো দিবস ও শোকের দিবস হিসাবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। যে শহরের মানুষের ঘরবাড়ী ও দোকান-পাটের ছাদে ছাদে এতোদিন কালো পতাকা উড়েছে সে শহরের মানুষের অনতরে কালো ছায়া স্থায়ী হয়ে গেল। কোনো যুদ্ধ ঘোষণা হয়নি ২৬ আগস্ট। তারপরেও জনগণকে যাদের নিরাপত্তা দেবার কথা তারাই গুলি চালিয়েছে জনগণের উপর। এতে অনতত পাঁচজন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন অনেক মানুষ। এ অনাকাঙ্ক্ষিত হত্যাকাণ্ড কেন ঘটল তা খুঁজে বের করার জন্য স্বরাষ্ট্র মনত্রী ঘোষণা দিয়েছেন। আর যে এশিয়া এনার্জি এসবের কেন্দ্রবিন্দুতে তার কতর্ৃপক্ষ বলেই দিয়েছে যে এ হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী বহিরাগত কিছু লোক যারা ফুলবাড়ী বা খনি এলাকার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন না। আসলে কী তাই? আমাদের একটু পিছন ফিরে দেখা দরকার। বুঝা দরকার খনি এলাকার মানুষের অনুভূতি ও মনের কথা।
২৬ আগস্ট আমরা ঢাকার কয়েকজন সকাল দশটা থেকে ফুলবাড়ীর রাস্তায়। আমরা এর আগেও কয়েকবার খনি এলাকায় ঘুরে এসেছি। কয়েকটি গ্রামে গিয়েছি খনির ব্যাপারে মানুষের মনের অবস্থা বুঝার জন্য। এশিয়া এনার্জির কর্মকর্তারা সবসময় বলে এসেছেন এলাকার অধিকাংশ মানুষ খনির পক্ষে। কিন্তু আমরা যেসব গ্রামে গিয়েছি সেখানকার মানুষেরা প্রথমেই তাদের তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উন্ম,ুক্ত পদ্ধতির খনির বিরুদ্ধে। কোথাও কোথাও আমাদের প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করেছেন তারা। তাদের সন্দেহ আমরা এশিয়া এনার্জির লোক, কারণ আমরা ঢাকা থেকে এসেছি। কিছু সময় নিয়ে তাদের বুঝাতে হয়েছে আমরা এশিয়া এনার্জির কর্মচারী নই। আমরা সবার কথা শুনে কিছু রিপোর্ট করতে চাই এবং প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণ করতে চাই। আদিবাসী ও বাঙালি উভয় গ্রামের মানুষই আমাদেরকে সাফ সাফ বলে দিয়েছেন আমরা যদি এশিয়া এনার্জির লোক হই তবে আমাদের নিস্তার নেই। তাদের পরিষ্কার কথা: "উন্মুক্ত কয়লা খনি চাই না। আমরা আমাদের মাটি ছেড়ে কোথাও যাব না।"
বিরামপুর উপজিলার বড় বুকচি গ্রামের এক সান্তাল নারীর কথা, "আমি আমার জমিতে মরে যাব তবু জমি ছাড়ব না।"
২৫ আগস্ট ফুলবাড়ী যাবার পথে আমরা একটি ধানক্ষেতে নামি, সেখানে কাজ করছেন এমন সাত-আটজন নারী-পুরুষের সাথে কথা বলার জন্য। কী প্রচণ্ড ক্ষোভ তাদের। সবার মুখে এক কথা "এ জমিন ছেড়ে কোথাও যাব না আমরা।" তারা জানালেন উন্মুক্ত কয়লাখনির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ জানাতে এবং এশিয়া এনার্জির অফিস ঘেরাও করতে তারা আগামীকাল ফুলবাড়ী শহরে যাবেন। তারা এশিয়া এনার্জির যথাশীঘ্র বিদায় চাইছেন ফুলবাড়ী থেকে। আমরা মূলত এসব মানুষের প্রতিক্রিয়া অনুভব করার জন্যই ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ীর রাস্তায়।
গ্রামের মানুষ আসতে শুরু করবে দুটার পর থেকে। আমরা একটি ছোট রেস্টুরেন্টে একটা বাজবার আগেই দুপুরের খাবার খেয়ে নিই। অন্যদিনের মতো অনেক আইটেম রান্না হয়নি রেস্টুরেন্টে। কারণ রেস্টুরেন্ট মালিকের ভয় আজ বেচাকেনা হবে না এবং যেকোনো সময় রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে দিতে হতে পারে। আমরা একটার পরপরই ফুলবাড়ী শহরে ঢোকার পথে ঢাকা মোড়ের দিকে রওনা হই। এখানেই বিভিন্ন দিক থেকে আসা মিছিল জড়ো হবে এবং রওনা দিবে এশিয়া এনার্জির অফিস ঘেরাও করার জন্য। বিডিআর ভর্তি বেশ কয়েকটি ট্রাক টহল দিচ্ছে প্রধান সড়ক ধরে। ফুলবাড়ী থানার মধ্যেও বিস্তর পুলিশের প্রস্তুতি চলছে। বিশেষ করে বিডিআর-এর টহল ভালো লক্ষণ বলে মনে হলো না।
দুপুর দুটোর পর থেকে লোকজন জড়ো হতে থাকে। খবর আসে বিরামপুর থেকে গ্রামবাসীকে আসতে বাধা দিচ্ছে পুলিশ। পরে অবশ্য তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে এ খবরও পাই। তিনটা বাজতে বাজতে ঢাকা মোড় লোকে লোকারণ্য। তিনদিক থেকে মিছিল করে হাজার হাজার বাঙালি-আদিবাসী জড়ো হতে থাকে ঢাকা মোড়ে এবং প্বার্শবর্তী ফুলবাড়ী জি, এম, পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় চত্বরে। সান্তালদের কেউ কেউ এসেছেন ঢোল বাজাতে বাজাতে। কয়েকজনের হাতে তীর ধনুক যা সান্তালদের প্রতিবাদের প্রতিকী ভাষা। বিক্ষোভকারীদের অধিকাংশের হাতে বাঁশের লাঠি। কারো হাতে 'লাদনা' লাঠি, মানে বড় লাঠি। শ্লোগান, ব্যানার, ফ্যাস্টুন ও লাঠি উচিয়ে গ্রাম ও শহরের মানুষেরা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকে এশিয়া এনার্জি ও সরকারকে উদ্দেশ করে। এগারোটা থেকেই একটি ট্রাকে সংস্কৃতিকর্মীরা গাইছেন গণসঙ্গীত। মাঝে মাঝে বক্তৃতা। তিন-সাড়ে তিনটার দিকে ঢাকা মোড় জনসমুদ্রে পরিণত হয়ে যায়। হাজারে হাজারে লাঠি উচিয়ে ক্ষুব্ধ মানুষ তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে থাকেন। এরই মধ্যে ঢাকা মোড়ে মিছিল করে উপস্থিত হন বিক্ষোভ ও এশিয়া এনার্জির অফিস ঘেরাও কর্মসূচির আয়োজক তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদু্যৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ঢাকা থেকে আসা এবং এলাকার নেতৃবৃন্দ। কিছুক্ষণের মধ্যে বিশাল মিছিল শ্লোগানে শ্লোগানে চারদিক প্রকম্পিত করে রওনা দেয় এশিয়া এনার্জির অফিস অভিমুখে। ঢাকা মোড় থেকে এশিয়া এনার্জির মূল অফিসের দূরত্ব দুই কিলোমিটারের মতো। মাঝে কোম্পানির তথ্যকেন্দ্র। এ তথ্যকেন্দ্রের প্রতিও মানুষের ক্ষোভের শেষ নেই। মিছিলকারীদের একটি অংশ এ তথ্যকেন্দ্রের উপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে।
ফুলবাড়ী শহরের মূল অংশ ছোট যমুনা নদীর পূবপাশে। সরু নদীর উপর ছোট একটি ব্রীজ। ব্রীজের ঐ পাড়ে এশিয়া এনার্জির মূল অফিস এবং ল্যাবরেটরি যেখানে ১৫০টি ড্রিলিং সাইট থেকে তুলে আনা কয়লার নমুনা সংরক্ষণ করা ছিল। ব্রীজের কাছেই বিডিআর, পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছিল যাতে মিছিল নদীর ওপারে এশিয়া এনার্জির অফিসের দিকে যেতে না পারে। কর্মসূচির আয়োজকদের সাথে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের আলাপের কিছুক্ষণ পরেই শুরু হয় গুলি, টিয়ার গ্যাসের সেল নিক্ষেপ, লাঠিচার্জ। এসব ঘটে প্রধানত ছোট যমুনার পশ্চিম পাড়ে। সংবাদ মাধ্যমের রিপোর্ট থেকে পাঠক বিসতারিত জানতে পেরেছেন কীভাবে বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি, লাঠি ও টিয়ার গ্যাস চলেছে।
২৬ আগস্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলি চালাবার পর থেকে ফুলবাড়ী ও তার আশপাশ এলাকায় মানুষেরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। দেশব্যাপী নিন্দার ঝড়। বিশ্বব্যাপী জানাজানি হয়ে গেছে ফুলবাড়ীতে সাধারণ মানুষের উপর নির্মম হামলার কথা। ফুলবাড়ী ও খনি এলাকার মানুষের এখন একটাই দাবি: এশিয়া এনার্জিকে ফুলবাড়ী ও বাংলাদেশ ছাড়তে হবে।
ফুলবাড়ীতে এই যে নির্মমতা আমরা দেখলাম তার সঠিক কারণ অন্বেষণের চেষ্টা হওয়া উচিত এখন। খনি এলাকার মানুষের মনের কী অবস্থা সে সম্পর্কে ইতিমধ্যে কিছুটা বলেছি। যতবার ফুলবাড়ী রক্ষা কমিটির নেতৃবৃন্দ ও এলাকাবাসীর সাথে কথা বলেছি সবসময় তারা একটি অভিযোগ করেছেন এবং তা হলো উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনি হবে এমন কথা এশিয়া এনার্জি তাদেরকে স্পষ্ট করে বলেনি।
কিন্তু তারা যখন থেকে জানতে পেরেছেন এ পদ্ধতিতে কয়লা খনি হলে তাদেরকে উচ্ছেদ হতে হবে তখন থেকেই তারা এর বিরোধিতা করছেন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে দেখেছি কীভাবে তারা এশিয়া এনার্জিকে প্রতিহত করার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। যে কয়লার উপর বসে আছে শতাধিক গ্রাম, সোনালি ফসলের মাঠ, শালবন, শত শত মসজিদ, মন্দির, গীর্জাঘর, কবরস্থান এবং নানা স্থাপনা তার সবই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে একথা ভেবে মানুষগুলো বেদনাহত হলেও তারা যে সংঘবদ্ধ এবং প্রতিরোধে সক্ষম, জীবন দিয়ে তা প্রমাণ করেছেন।
হত্যাকাণ্ডের পরের দিন অর্থাৎ ২৭ আগস্ট এশিয়া এনার্জির প্রধান নির্বাহী গেরি লাই এক বিবৃতিতে বিক্ষোভ কর্মসূচির আয়োজকদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছেন তার প্রতি তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়ে ফুলবাড়ী রক্ষা কমিটির যুগ্ম আহবায়ক মোহাম্মদ খুরশীদ আলম মতি বলেছেন, "ফুলবাড়ী ও খনি এলাকার অন্যান্য মানুষ অত্যনত স্বতঃস্ফুর্তভাবে ২৬ আগস্ট বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছেন। কোনো বহিরাগত এখানে উস্কাতে আসেনি। আমরা এশিয়া এনার্জির হাত থেকে নিস্কৃতি চাই। এশিয়া এনার্জির বহিস্কার চাই।"
মি. গ্যারী লাই তেল গ্যাস রক্ষা কমিটির যেসব নেতা এবং অন্যরা যারা ঢাকা থেকে গিয়েছেন তাদেরকে বলছেন বহিরাগত। তার এ বক্তব্য অত্যন্ত ধৃষ্টতাপূর্ণ। ফুলবাড়ীতে এতো বড় কয়লা প্রকল্প যা আবার উন্মুক্ত পদ্ধতিতে! এটি যেমন স্থানীয় বিষয়, তেমনি জাতীয়। বাংলাদেশের যেকোনো নাগরিকেরই এ প্রকল্প সম্পর্কে জানার সম্পূর্ণ অধিকার আছে এবং মতামত দেবারও অধিকার আছে। সেইখানে ঢাকার মানুষ হয়ে গেল বহিরাগত এবং মি. গ্যারী লাই এবং এশিয়া এনার্জির সাহেবরা হয়ে গেলেন ফুলবাড়ীর জনগণের অংশ!
খনির ব্যাপারে সাধারণ তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তাহলো এশিয়া এনার্জির কর্মকর্তারা সবসময় সংবাদমাধ্যমকে কোম্পানির অনুকূলে প্রভাবিত করতে চেয়েছেন। অস্বাভাবিক নয়। যেকোনো কোম্পানিই জনসংযোগ করবে। তবে ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খনি করার পরিকল্পনা নিয়ে পর্যাপ্ত অনুসন্ধানী রিপোর্ট ও বিশ্লেষণ সংবাদমাধ্যমে দেখা যায়নি। এক্ষেত্রে এশিয়া এনার্জির প্রভাব কাজ করেছে। এশিয়া এনার্জি তিনশো বিদেশী ও দেশী পরামর্শক দিয়ে আঠারো মাস কাজ করিয়ে হাজার হাজার পৃষ্ঠার প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এদের মধ্যে বাংলাদেশে কর্মরত দুটো শীর্ষ পরিবেশ প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও রয়েছেন। কাজেই তথ্যের ব্যাপারে কোম্পানির কথা হলো এদের তৈরি করা তথ্য-উপাত্ত-বিশ্লেষণই সঠিক এবং সবার শীরোধার্য। মানলাম অনেক কিছু আছে এসব রিপোর্টে। কিন্তু ইংরেজিতে তৈরি করা এসব প্রতিবেদন কজন পড়ার ও বুঝার সুযোগ পেয়েছেন। খনি এলাকার অধিকাংশ মানুষের সোজা হিসাব: কোম্পানি তাদের সাথে প্রতারণা করেছে। তাদের রিপোর্টে আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। জনগণের এই যে সেন্টিমেন্ট তা কোম্পানি বরাবর অবজ্ঞা করে এসেছে। তার উপর জনগণের উপর চলেছে গুলি। যাদের মাটির নিচে কয়লায় হাত দিবে কোম্পানি তাদের উপরই গুলিবর্ষণ। জনমনে এর প্রতিক্রিয়া এমন মারাত্মক হয়েছে যে তাদের বেধে দেয়া সময়সীমার মধ্যে এশিয়া এনার্জি ফুলবাড়ী ত্যাগ না করায় তারা ২৮ আগস্ট জ্বালিয়ে দিয়েছে ফুলবাড়ীতে এশিয়া এনার্জির তথ্য কেন্দ্র ও তছনছ করেছে ল্যাবোরেটরি। এই ল্যাবোরেটরিতেই রক্ষিত ছিল ১৫০টি ড্রিলিং সাইট থেকে সংগ্রহ করা কয়লার নমুনা। নমুনা অবশ্য বিদেশেও সংরক্ষিত আছে নিশ্চয়। ফুলবাড়ী থেকে এশিয়া এনার্জির কর্মচারীরা পুলিশ প্রহরায় দিনাজপুর হয়ে ঢাকা চলে এসেছেন। খনি এলাকার মানুষের দাবি শুধু ফুলবাড়ী নয়, বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে এশিয়া এনার্জিকে।
ফুলবাড়ীতে যে ঝড় উঠেছে তার অবসান ঠিক কীভাবে হবে বলা শক্ত। তবে একটা ব্যাপার পরিষ্কার, জনগণ এমনভাবে ক্ষীপ্ত হয়েছে যে তাদের উপর জোরজুলুম চালিয়ে বিশেষ কোনো কাজ হবে না। একটি কথা মনে রাখা জরুরি এবং তাহলো যে মাটির নিচে ২৭ কোটি বছরের পুরানো কয়লা জমে আছে সে মাটির মালিক এলাকার মানুষ। সেই মাটি ও মানুষকে রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। যেক'টি জীবন চলে গেছে তা ফিরে পাওয়া যাবে না। কিন্তু ফুলবাড়ীর মানুষের রাজনৈতিক সুরক্ষা হোক এটিই সেখানকার মানুষের মূল দাবি।
|